| শিরোনাম |
|
পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক অবহেলায় ঈশ্বরগঞ্জে বিষপানে মৃত্যু
গনকণ্ঠ প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ:
|
![]() পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক অবহেলায় ঈশ্বরগঞ্জে বিষপানে মৃত্যু নিহত সাইফ উদ্দিন ওই গ্রামের মৃত উসমান গণির ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। মাঝেমধ্যে গ্রামে ফিরলেও স্থায়ীভাবে কোথাও বসবাস করতেন না। নিহতের বড় ভাই জয়নাল আবেদীন গণমাধ্যমকে জানান, ছোটবেলা থেকেই সাইফ উদ্দিন পরিবার ছেড়ে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছিলেন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর সময়েও তিনি বাড়িতে ফেরেননি। সম্প্রতি হঠাৎ করে গ্রামে ফিরে আসেন। মঙ্গলবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বুধবার রাতে এশার নামাজের পর বাড়ির উঠোনে এসে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় তার শরীর থেকে বিষের গন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সাইফ উদ্দিন গ্রামে যতবারই ফিরতেন, ততবারই পারিবারিক কলহ ও ঝগড়া-বিবাদ চলতো। স্থানীয়দের ধারণা, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি, একাকিত্ব ও সামাজিক অবহেলা তার মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিষপানের সিদ্ধান্তের পেছনে এসব বিষয়ও একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। পরিবার সূত্রে আরও জানা যায়, সাইফ উদ্দিন অবিবাহিত ছিলেন কি না—এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, যা তার ব্যক্তিগত জীবনের অনিশ্চয়তা ও বিচ্ছিন্নতার দিকটিই আরও স্পষ্ট করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত একটি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ, অনিয়মিত জীবিকা, সামাজিক বন্ধনের অভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীনতা—সব মিলিয়ে সাইফ উদ্দিনের জীবন ছিল অনিশ্চয়তা ও নিঃসঙ্গতায় ভরা। বাংলাদেশে আত্মহত্যা বা সন্দেহজনক মৃত্যুর বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক সহায়তার অভাব। কিন্তু এসব বিষয় এখনো যথাযথ গুরুত্ব পায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে— পরিবারে বিচ্ছিন্ন সদস্যদের প্রতি যেমন সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে তেমনি গ্রামীণ পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধু আইনগত তদন্ত নয়, সামাজিক ও মানবিক দিকগুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাইফ উদ্দিনের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ শুধু অভাবেই নয়, অবহেলা ও একাকিত্বেও ভেঙে পড়ে। সময় থাকতেই সেই নীরব সংকেতগুলো বুঝতে না পারলে, এমন মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হয়ে পড়বে। |