| শিরোনাম |
|
ভাসমান গুদামে বন্দী রমজানের খাদ্য; চট্টগ্রাম বন্দরের নীরবতায় গভীর সংকট
নিজস্ব প্রতিবেদক :
|
![]() ভাসমান গুদামে বন্দী রমজানের খাদ্য; চট্টগ্রাম বন্দরের নীরবতায় গভীর সংকট গণমাধ্যম সূত্র অনুযায়ী, গম, ভুট্টা, ডাল, ছোলা, সয়াবিন ও চিনি—রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন এসব পণ্য ঘাটে নামার বদলে জাহাজেই আটকে থাকায় মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাসে মারাত্মক জট তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানায়, চলতি জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে ১৪৬টি মাদারভেসেল অবস্থান করছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৯৯টি। বর্তমানে অবস্থানরত জাহাজগুলোর মধ্যে ১১২টিই বাল্কপণ্যবাহী। ডব্লিউটিসিসি (ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল) সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৪টি ঘাটে অন্তত ৬৩০টি লাইটার জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ১৩৪টি জাহাজ ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে পণ্য নিয়ে আটকে আছে। আশুগঞ্জ, কাঁচপুর, হাসনাবাদ, নিতাইগঞ্জ, নোয়াপাড়া, নারায়ণগঞ্জ ও কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন ঘাটে এই জট সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। গণমাধ্যম সূত্রে আরও জানা যায়, আশুগঞ্জ ঘাটে টিএসপি সার নিয়ে ‘এমভি আনিসা জান্নাত-১’ নামের একটি লাইটার জাহাজ টানা ৪৭ দিন ধরে অবস্থান করছে। একইভাবে ‘এমভি শুভরাজ-৮’ ৪৬ দিন এবং ‘এমভি ফজলুল হক-৭’ ৩৭ দিন ধরে পণ্য নিয়ে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় যেখানে একটি লাইটার জাহাজ এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে খালাস শেষ করার কথা, সেখানে বর্তমানে সময়সীমা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বন্দর ও নৌপরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, এই সংকটের পেছনে বড় আমদানিকারক গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত গুদাম ও স্টোরেজ সুবিধা না রেখেই বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে সেগুলো লাইটার জাহাজে রেখে ধাপে ধাপে বাজারে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে লাইটার জাহাজ দীর্ঘদিন আটকে থাকছে, অন্যদিকে বাজারে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম সরবরাহ সংকট। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য উদ্ধৃত করে গণমাধ্যম জানায়, বড় বড় আমদানিকারকরা লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। এতে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে, আর জাহাজের ডেমারেজ তাদের কাছে তুলনামূলকভাবে গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত শিপিং এজেন্টদের তথ্য অনুযায়ী, লাইটারেজ সংকটের কারণে মাদারভেসেলগুলোর গড় অবস্থানকাল বেড়ে গেছে এবং প্রতিটি জাহাজকে দৈনিক ১০ থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশে নিবন্ধিত পণ্যবাহী লাইটার জাহাজের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৫৮টি। তবে শিপিং ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, কার্যকর ও বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য লাইটারের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। ডব্লিউটিসিসির অধীনে থাকা লাইটারগুলোর বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ঘাটে পণ্য নিয়ে আটকে থাকায় নতুন করে খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট মহল। বন্দর পরিচালনা সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, বন্দরের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হলো স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা, অযৌক্তিক জট নিরসনে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে তাৎক্ষণিক নির্দেশ জারি করা। তবে গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত কোনো টাইম-বাউন্ড আনলোডিং নির্দেশ, রাতভিত্তিক খালাস কার্যক্রম, বিকল্প জেটি ব্যবহারের উদ্যোগ কিংবা দীর্ঘদিন আটকে থাকা জাহাজের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে গণমাধ্যম জানায়, লাইটারেজ সংকটের কারণে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটছে এবং জাহাজের অবস্থানকাল বাড়ছে। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও জানান। তবে গণমাধ্যম বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে খাদ্যশস্য আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—এই তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জানা ছিল। তবুও রমজান সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি ও কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতিতে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যমে উদ্ধৃত সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে যদি বন্দর চেয়ারম্যান নিজ ক্ষমতা ও বিবেচনায় জরুরি সিদ্ধান্ত না নেন, তাহলে তা কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, দায়িত্বে অবহেলার শামিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি স্পষ্টভাবে policy paralysis-এর একটি উদাহরণ। রমজানের মতো সংবেদনশীল সময়ে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বিঘ্ন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়—গণমাধ্যম বিশ্লেষণে এটিকে জনঅসন্তোষ, সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক ঝুঁকির সম্ভাব্য উৎস হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছে। এখনো সময় আছে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। নচেৎ এই নীরবতার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে, আর চট্টগ্রাম বন্দরের এই পরিস্থিতি ইতিহাসে গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হতে পারে। |