বুধবার ১৩ মে ২০২৬ ০৯:০৫:৪৫ এএম
শিরোনাম গাসিক এ মাসব্যাপী কর মেলা উদ্বোধন প্রশাসকের বাজার পরিদর্শন        আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস উদযাপন করল বিআরবি হসপিটালস        চুনারুঘাটের চা বাগানে এমপি ফয়সলের নেতৃত্বে চলছে উন্নয়ন কাজ        ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্রলীগের আকস্মিক মিছিল, সর্বস্তরে সমালোচনার ঝড়        ধোবাউড়ায় নেতাই নদীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ ড্রেজার উচ্ছেদে অভিযান        ডেমরায় রাজউক– নীরবতা, ইমারত পরিদর্শক মোঃ অমিত হাসান এর বিরুদ্ধে ঘুষ ও অসহযোগিতার অভিযোগ        নদীতে গোসলে নেমে নিখোঁজ প্রতিবন্ধী কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার       
রাষ্ট্রপতি, সংবিধান ও সংবাদপত্র: অন্তর্বর্তী শাসনামলে ক্ষমতা, নীরবতা ও আলোর প্রশ্ন
দেলোয়ার জাহিদ :
Published : Wednesday, 25 February, 2026
রাষ্ট্রপতি, সংবিধান ও সংবাদপত্র: অন্তর্বর্তী শাসনামলে ক্ষমতা, নীরবতা ও আলোর প্রশ্ন

রাষ্ট্রপতি, সংবিধান ও সংবাদপত্র: অন্তর্বর্তী শাসনামলে ক্ষমতা, নীরবতা ও আলোর প্রশ্ন

বাংলাদেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ভেঙে ফেলা এবং একটি সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল—এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে। দৈনিক কালের কণ্ঠ–কে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি যে অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ তুলে ধরেছেন, তা কেবল একজন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়; বরং তা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী শাসনামলের ক্ষমতাকাঠামো, সাংবিধানিক চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, দেড় বছরের বেশি সময় তাঁকে কার্যত ক্ষমতাহীন ও বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রতীকী প্রধান হলেও তাঁর কিছু মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে—সরকারপ্রধানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত থাকা এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য রক্ষা করা। কিন্তু এসব সাংবিধানিক রীতিনীতি পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। ফলে প্রশ্ন ওঠে—অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য কি রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে চলা অপরিহার্য ছিল, নাকি এটি ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক কৌশল?

এই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো রাষ্ট্রপতি অপসারণের একাধিক অসাংবিধানিক উদ্যোগের অভিযোগ। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসানোর চেষ্টা, বঙ্গভবন ঘেরাও এবং ‘মব’ তৈরির মতো ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে অস্থিতিশীল করার একটি ধারাবাহিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়া খুবই জরুরি—কারণ বিষয়টি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক চর্চার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: অন্তর্বর্তী শাসনামল কি সত্যিই একটি নিরপেক্ষ সেতুবন্ধন ছিল, নাকি এটি নতুন এক ধরনের প্রশাসনিক একচ্ছত্রতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল? রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার এক বিপজ্জনক নজির সে সময়ে স্থাপন করা হয়েছিল যার রেশ এখনো রয়েছে।

এই বিশ্লেষণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের ভিত্তি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠান যদি দুর্বল হয়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো সরকারই সংবিধানের সীমারেখা অতিক্রম করার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাবে। এই কারণে সাক্ষাৎকারটি কেবল অতীতের হিসাব নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এই সাহসী ও অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য কালের কণ্ঠের সাংবাদিক হায়দার আলী ও জয়নাল আবেদীন কৃতিত্বের দাবিদার।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: আলো নাকি ছায়া?

দীর্ঘ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের অনুচ্ছেদ বা আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। ইতিহাস দেখিয়েছে—একটি দেশ নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, সংবাদপত্র প্রকাশের অনুমতি দিতে পারে; তবু যদি সাংবাদিকরা ভয়, নীরবতা বা আত্ম-সেন্সরশিপে বন্দী থাকেন, তবে প্রকৃত স্বাধীনতা অনুপস্থিত থাকে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের দৃষ্টিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অনুমতি নয়, সুরক্ষার বিষয়। এটি বাগ্মিতার নয়, অনুশীলনের প্রশ্ন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘মব’ সংস্কৃতির উত্থান, বিচারক ও শিক্ষকদের হেনস্তা, প্রশাসনিক প্রতিশোধ এবং সাংবাদিকদের ওপর অদৃশ্য চাপ—সব মিলিয়ে এক নতুন ধরনের দমনমূলক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৯ অনুচ্ছেদ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও বাস্তবে সাংবাদিকরা যদি সত্য প্রকাশের আগে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাব কষতে বাধ্য হন, তবে সেই অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে।

ইতিহাস আমাদের পথ দেখায়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সময় The Washington Post–এর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতাকেও জবাবদিহিতার মুখে দাঁড় করিয়েছিল। সেখানে আলো এসেছিল কারণ সত্যকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়েছিল, দমন করা হয়নি।

এর বিপরীতে, আজ বহু দেশে অস্পষ্ট আইন—জাতীয় নিরাপত্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার অজুহাতে—সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। যখন সত্য বলার ফল হয় গ্রেপ্তার, নির্বাসন বা নিখোঁজ, তখন যত সংবাদমাধ্যমই থাকুক, স্বাধীনতা অন্ধকারেই থাকে।

এই কারণেই রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দেশকে মূল্যায়ন করে এই প্রশ্নে—সাংবাদিকরা কি ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্যাতন ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরতে পারেন?

জর্জ অরওয়েলের ভাষায়, সাংবাদিকতা হলো এমন কিছু ছাপানো যা কেউ ছাপাতে চায় না; বাকিটা জনসংযোগ। এই উক্তি আজও প্রাসঙ্গিক।

উপসংহারে বলা যায় - আলো একটি শর্ত, দাবি নয়
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোনো সরকারি ঘোষণায় আসে না। এটি বাস্তব হয় তখনই, যখন—
সাংবাদিকরা ভয় ছাড়াই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারেন
সত্য জবাবদিহিতার জন্ম দেয়, প্রতিশোধের নয়
আইন নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে, কর্তৃত্বের নয়
নীরবতা পছন্দ হিসেবে থাকে, চাপ হিসেবে নয়

এই অর্থে বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেবল একটি গণতান্ত্রিক সূচক নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার ও বিবেকের আয়না।

যেখানে সত্য অবাধে চলতে পারে, সেখানেই সংবাদপত্র আলোতে থাকে।
আর যেখানে সত্য ফিসফিস করে—অথবা অদৃশ্য হয়ে যায়—সেখানে অন্ধকার ইতিমধ্যেই নেমে এসেছে। যা বাংলাদেশের সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান।

এই অন্ধকারে আলো জ্বালানোর দরজা কালের কণ্ঠ জনগণের জন্য খুলে দিয়েছে। এখন সেই দরজাটি রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা, সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা




« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







সর্বশেষ সংবাদ
⇒সর্বশেষ সব খবর...
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর: মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন জিটু
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : প্ল্যানার্স টাওয়ার, ১০তলা, ১৩/এ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামটর, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮-০২-৪১০৬৪১১১, ৪১০৬৪১১২, ৪১০৬৪১১৩, ৪১০৬৪১১৪, ফ্যাক্স: +৮৮-০২-৯৬১১৬০৪,হটলাইন : +৮৮-০১৯২৬৬৬৭০০৩-৪
ই-মেইল : pressgonokantho@gmail.com, videogonokantho@gmail.com, cvgonokantho@gmail.com, editorgonokantho@gmail.com, web : www.gonokantho.com