| শিরোনাম |
|
মব জাস্টিসের আড়ালে ঘরবাড়ি ভাঙচুর: তিন জেলায় মাদক কারবারিদের ওপর জনতার ‘উগ্র’ চড়াও, নেপথ্যে জামিন ও বিচারহীনতা
মো: আরিফুল ইসলাম (আরিফ)
|
ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভোলার দক্ষিণ আইচাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চিহ্নিত মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অতিষ্ঠ জনতার এই উগ্র আচরণকে একদিকে যেমন ‘বিচারহীনতার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে একে চরম ‘আইন বহির্ভূত কর্মকাণ্ড’ বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে প্রশাসন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এসব এলাকায় মাদক কারবারিদের বাড়ি-ঘরে আকস্মিক হামলা, ভাঙচুর এবং প্রকাশ্য দিবালোকে গণপিটুনির মতো একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।আইনশৃঙ্খলার এই চরম অবনতি এবং গণআদালত স্টাইলে সাজা দেওয়ার বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো নাগরিকেরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন, তাকে শাস্তির মুখোমুখি করার একক দায়িত্ব কেবল আদালতের। তবে সাধারণ মানুষ কেন এমন চরম পথ বেছে নিচ্ছে, তার পেছনে গভীর কিছু সামাজিক ও বিচারিক সংকটকে দায়ী করেছেন এই সিনিয়র আইনজীবী। অনুসন্ধানে জানা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পরও বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আইনি ফাঁকফোকর গলে আসামিরা গ্রেফতারের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই খুব সহজে জামিন পেয়ে যায় এবং মুক্ত হয়েই বুক ফুলিয়ে আবারও একই এলাকায় পুরনো মাদক সাম্রাজ্য চালু করে। যেসব এলাকায় গণপিটুনি বা বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার প্রায় প্রতিটি মাদক কারবারির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তারা বারবার সামাজিকভাবে বয়কট হওয়ার পরও বিন্দুমাত্র সংশোধন হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে চলা মাদকের ছোবলে নিঃস্ব হয়ে পড়া সাধারণ মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তারা আইনি ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ক্ষোভের বশে এই ধরণের সহিংস পথ বেছে নিচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এরই মধ্যে ভোলার দক্ষিণ আইচা এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে এক ভিন্ন ও রহস্যজনক চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে গ্রামীণ ছাত্রদলের সভাপতির নেতৃত্বে একদল যুবককে এই ‘মাদকবিরোধী’ অ্যাকশনে অংশ নিতে দেখা গেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে নতুন সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মাদক নির্মূলের আড়ালে কিছু জায়গায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধার করা হচ্ছে। একই সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও প্রকাশ্য দিবালোকে মাদক কারবারিদের ধাওয়া ও নিষ্ঠুরভাবে গণপিটুনি দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পুরো এলাকাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন এখন মাদকবিরোধী সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ভোলা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি এবং এর বিরুদ্ধে নিয়মিত সরকারি অভিযান চলমান রয়েছে। কিন্তু মাদক নির্মূলের দোহাই দিয়ে যারা গণপিটুনি দিচ্ছে কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর করছে, তারা স্পষ্টত আইনবিরোধী অপরাধ করছে। এই ধরণের মব জাস্টিস বা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমাজ থেকে মাদকের মূল উপড়ে ফেলতে হলে যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতা প্রয়োজন, ঠিক তেমনই বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। অন্যথায়, ‘মাদক নির্মূলের’ এই অনিয়ন্ত্রিত হিড়িক সমাজে আরও বড় ধরণের অরাজকতা ও অপরাধের জন্ম দেবে। |