| শিরোনাম |
|
উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য নেই, হতাশায় বাঁশখালীর লবণচাষীরা
গনকণ্ঠ প্রতিবেদক (চট্টগ্রাম)
|
![]() উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য নেই, হতাশায় বাঁশখালীর লবণচাষীরা এ এলাকার অধিকাংশ লবণচাষী যুগের পর যুগ ধরে পারিবারিকভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিকে শুরু হয় লবণ মাঠ প্রস্তুতের কাজ, যা চলে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত। শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগ করেও চলে টানা শ্রম। প্রায় ছয় মাস ধরে অব্যাহত থাকে এই কষ্টসাধ্য কর্মযজ্ঞ। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর মধ্যে কক্সবাজার ও খুলনার পর চট্টগ্রামের একমাত্র উপজেলা হিসেবে বাঁশখালীতেই বাণিজ্যিকভাবে লবণ উৎপাদন হয়ে থাকে। উপজেলার পশ্চিম পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা, চাম্বল ডিপুটিঘোনা, শীলকূপের পশ্চিম মনকিচর, সরল, কাথরিয়া ও খানখানাবাদ (আংশিক) এলাকায় ব্যাপকভাবে লবণ চাষ হয়। প্রতিবছরের মতো চলতি মৌসুমেও কয়েক হাজার লবণচাষী মাঠে নেমেছেন। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশা কাটছে না তাদের। আগের মৌসুমের শত শত মেট্রিক টন লবণ এখনও চাষিদের কাছে মজুত রয়েছে। লবণচাষীরা জানান, সাগরের লবণাক্ত পানি ব্যবহার করেই লবণ উৎপাদন করা হয়। প্রথমে কাঠের রোলার দিয়ে জমি সমতল করে চারপাশে মাটির আইল তুলে ছোট ছোট প্লট তৈরি করা হয়। এরপর প্লট শুকিয়ে গেলে কালো বা নীল রঙের পলিথিন বিছানো হয়। জোয়ারের সময় নালা কিংবা ইঞ্জিনচালিত শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সাগরের পানি প্লটে ঢোকানো হয়। ৪ থেকে ৫ দিন কড়া রোদে রাখার পর পানি শুকিয়ে গেলে পলিথিনের ওপর লবণ জমে ওঠে। তারা আরও জানান, শীতের কুয়াশা লবণ উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর। উৎপাদনের পর লবণ শুকিয়ে গেলে তা ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে এসব লবণ কারখানায় নিয়ে পরিশোধন করে বস্তা বা প্যাকেটে বাজারজাত করা হয়। বর্তমানে উপকূলজুড়ে মাঠের পর মাঠজুড়ে পলিথিন বিছিয়ে লবণ উৎপাদনের দৃশ্য চোখে পড়ছে। প্রতিদিন পলিথিনে ছিদ্র হয়েছে কি না তা নজরদারি করতে হয়, প্রয়োজনে সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন করতে হয়। সরেজমিনে ছনুয়া ছেলবন এলাকায় দেখা যায়, একদল লবণচাষী পাইকারি দরে লবণ বিক্রি করে বড় জাহাজে তুলে দিচ্ছেন। তবে মুখে হাসি নেই কারও। একদিকে উৎপাদন কম, অন্যদিকে বাজারদরও নিম্নমুখী দুই চাপেই বিপর্যস্ত তারা। স্থানীয় লবণচাষী মো. মিনহাজ বলেন, বর্তমানে মণপ্রতি লবণের পাইকারি মূল্য ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। অথচ প্রতি মণে শ্রমিক খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এক কানি জমিতে লবণ চাষে জমির লাগিয়ত বাবদ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, পলিথিন বাবদ প্রায় ১০ হাজার টাকা এবং শ্রমিক, সেচসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এর ওপর পাইকাররা প্রতি মণে অতিরিক্ত ১০ কেজি লবণ নিয়ে যায়। একই অভিযোগ করেন লবণচাষী মো. করিম, জিয়াব উদ্দিন, ফজল করিম, জোনাইদ ও বাদশা। তাদের ভাষ্য, মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও চাষীরা ন্যায্যমূল্য ও পরিশ্রমের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উত্তর-পশ্চিম গন্ডামারা লবণ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লি.–এর সহসভাপতি মো. ওসমান গণি জানান, গত মাসে শুধু গন্ডামারা এলাকা থেকেই প্রায় ৪০ হাজার মণ লবণ বিক্রি হয়েছে। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় গন্ডামারা ও সরল এলাকায় এখনও ৩০ থেকে ৪০ হাজার মণ লবণ মজুত রয়েছে। এতে চরম হতাশায় দিন কাটছে চাষিদের। তিনি আরও জানান, সমিতির আওতায় ৬ থেকে ৭ শত কানি জমিতে লবণ চাষ হলেও অনেক মাঠ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে অনেক চাষী ধীরে ধীরে এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, একসময় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পকারখানার মালিকরা সরাসরি এলাকায় এসে লবণ কিনলেও এখন তারা আগ্রহ হারিয়েছেন। গত ৫ আগস্টের পর থেকে লবণ বিক্রির জন্য তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। তার ধারণা, আমদানিকৃত লবণ ও অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দেশীয় লবণের দাম কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিসিকের কার্যকর তদারকি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম না থাকায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে। শিল্পকারখানার জন্য আমদানিকৃত উদ্বৃত্ত লবণ আইন ও জনস্বাস্থ্য বিধি উপেক্ষা করে বাজারে ছাড়ায় মাঠপর্যায়ে লবণের দাম আরও পড়ে যাচ্ছে। সরকারি সহায়তার অভাবে মিল মালিক ও মহাজনরা কম দামে লবণ কিনে পরে তা বেশি দামে বাজারজাত করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিসিক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে বাঁশখালী ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার একর জমিতে প্রায় ৩০ হাজার লবণচাষী লবণ উৎপাদনে যুক্ত রয়েছেন। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি লবণ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু বাঁশখালী উপজেলাতেই প্রায় ২৫ হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। |