| শিরোনাম |
|
আগুনের ছায়া, ইরান আকাশে হামলা, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ছায়াপথ
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান:
|
![]() আগুনের ছায়া, ইরান আকাশে হামলা, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ছায়াপথ ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে দেখেছে। লেবানন, সিরিয়া ও গাজার প্রেক্ষাপটে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর উপস্থিতিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের উৎস হিসেবে বিবেচনা করে। সেই যুক্তিতেই সাম্প্রতিক হামলাকে তারা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় কোন আইন, নৈতিকতা বা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ভিত্তিতে একতরফা সামরিক হামলাকে বৈধ বলে গণ্য করা যায়? যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এই সমীকরণে আরও জটিল। ইসরায়েলের প্রধান সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে নিরাপত্তা সহায়তা, আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য ও কৌশলগত সমর্থন দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুবার ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো তাকে রক্ষা করেছে। এই বাস্তবতা প্রকাশ করে যে জোট-সমর্থন আঞ্চলিক সামরিক পদক্ষেপকে রাজনৈতিক শক্তি জোগায়। এই সমর্থনের ফলে আন্তর্জাতিক নৈতিকতা ও আইনশৃঙ্খলার দৃঢ়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নিয়মভিত্তিক ও আইনসম্মত করার কথা বললেও বাস্তবে মিত্র রাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে নীরব সমর্থন দেখায়। যখন নিয়ম ও আইন শক্তিধরের স্বার্থের কাছে বিকৃত হয়, তখন আন্তর্জাতিক আইন কেবল রীতিমূলক বাক্য হয়ে যায়। ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা নিঃসন্দেহে অত্যাধুনিক। লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ, দূরপাল্লার কৌশল এসব আধুনিক যুদ্ধের দক্ষতা। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, সামরিক শক্তি স্থায়ী শান্তি দিতে পারে না। প্রতিটি হামলা নতুন প্রতিরোধের জন্ম দেয়, প্রতিটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আগামী সংঘাতের বীজ নিহিত থাকে। গাজার অভিজ্ঞতা, লেবাননের সীমান্ত সংঘাত এবং সিরিয়ার অস্থিতিশীলতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করে। অর্থনৈতিক মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর এবং আশপাশের অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহের ওপর আঞ্চলিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাজারকে প্রভাবিত করে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বাণিজ্য ঝুঁকি, আর্থিক অস্থিতিশীলতা সব মিলিয়ে যুদ্ধ কেবল সীমান্তের ঘটনা নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিরও সংকট সৃষ্টি করে। অস্ত্রবাণিজ্য, প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক ব্যয় যুদ্ধের দীর্ঘায়নকে লাভজনক বাস্তবতা হিসেবে গড়ে তোলে। আজকের হামলা বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় যখন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৈশ্বিক জোটের সমর্থন পায়, তখন সংঘাতের পরিসর বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ইরান আকাশে বিস্ফোরণ দেখছে এক সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর আঘাত হিসেবে। প্রতিক্রিয়ার ভাষা কঠোর হচ্ছে। আঞ্চলিক মিত্ররা তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে। একটি ভুল পদক্ষেপ বৃহত্তর সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূগোল এক ভঙ্গুর ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে, যেখানে শক্তির প্রদর্শনই নতুন উত্তেজনার দ্যুতি বিস্ফোরণ ঘটায়। ইরানও আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় এবং প্রক্সি শক্তি ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করে। তাই তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না। তবে নিরাপত্তার নামে সামরিক আঘাত একমাত্র সমাধান নয়। সংলাপ, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা এসব বিকল্প পথ এখনও সক্রিয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থিত সামরিক পদক্ষেপ সবকিছু সংকুচিত করে দেয়। আজকের হামলা বিশ্বকে কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয় শক্তির রাজনীতি এখনো প্রাধান্যশীল। আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিক কাঠামো অনেক সময় জোট-সমর্থনের সামনে অসহায়। যখন শক্তিধর রাষ্ট্র অন্ধ সমর্থনে নিজেকে প্রভাবশালী করে তোলে, তখন সংলাপের পথ আরও সংকুচিত হয়। ইসরায়েলের এই আঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্নে শক্তির ব্যবহার সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, শক্তি দিয়ে শত্রুকে দমন করা যায়, কিন্তু অবিশ্বাস ও উত্তেজনা কমানো যায় না। প্রতিটি বিস্ফোরণ সাময়িকভাবে শান্তি রক্ষা করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিরোধের বীজও বপন করে। আজ বিশ্ব দাঁড়িয়েছে এক সন্ধিক্ষণে। মধ্যপ্রাচ্যের যে আগুন জ্বলছে, তা সংযমে নিভবে কি না, তা নির্ভর করছে কৌশল ও নৈতিকতার ওপর। জোট-রাজনীতির শক্তি যদি আত্মসমালোচনার পথ না খুঁজে, তবে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আরও দুর্বল হবে। শক্তি এবং ন্যায়ের মধ্যে এই দ্বন্দ্বই স্থির করবে আঞ্চলিক শান্তি স্থায়ী হবে কি না, বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে কি না। লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর mdraiyan6790@gmail.com |