শনিবার ১৮ জুলাই ২০২৬ ২১:০৭:১১ পিএম
শিরোনাম টাকা লেনদেনের জেরে ছোট ভাইয়ের বদলে বড় ভাইকে কুপিয়ে জখম, সন্ত্রাসীদের শাস্তির দাবিতে গৌরীপুরে বিক্ষোভ       জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে বগুড়া প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত        কুড়িগ্রামে একটি কলেজের অবৈধ ভাবে উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব সমালোচিত প্রশাসন       নরসিংদীতে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে দুই বন্ধুর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু        গাবতলীর দুর্গাহাটায় বৃক্ষরোপণকালে লালু ও জাকির        রাজধানীর ৫০টি পয়েন্টে অটোমেটিক ট্রাফিক লাইট সিস্টেম দ্রুত চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর       মানুষের সেবা করেই মন জয় করতে চাই: এমপি সৈয়দ মো. ফয়সল      
​সাংবাদিকের অনুসন্ধানী তথ্যে হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন : পিবিআইয়ের হাতে স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার
​মোঃ সিদ্দিকুর রহমান, স্টাফ রিপোর্টার, ভৈরব:
Published : Saturday, 6 June, 2026
​সাংবাদিকের অনুসন্ধানী তথ্যে হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন : পিবিআইয়ের হাতে স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার বহুল আলোচিত জাহাঙ্গীর মিয়া (৪২) হত্যা মামলার জট খুলেছে। দীর্ঘদিন ক্লু-লেস থাকা এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনী উন্মোচিত হয়েছে স্থানীয় এক সাংবাদিকের ব্যতিক্রমী ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে। তার দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে মামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), কিশোরগঞ্জ জেলা। গ্রেফতারকৃতরা হলেন—কুলিয়ারচর এলাকার হুসনা খাতুন (৪৫) এবং তার স্বামী ও মামলার মূল আসামি শহীদ মিয়া (৪৮)। ইতিমধ্যেই তারা দুজনেই বিজ্ঞ আদালতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

​তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২ জুলাই বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর মিয়া নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা রাতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরদিন ৩ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বড়খারচর মধ্যপাড়া এলাকার আসাদ মিয়ার একটি নেপিয়ার ঘাসের ক্ষেত থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জাহাঙ্গীরের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের মা দিলুয়ারা বেগম বাদী হয়ে ৪ জুলাই কুলিয়ারচর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-০৫, ধারা- ৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড) দায়ের করেন।

​মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ প্রায় দুই মাস তদন্ত করে পূর্ব শত্রুতার জেরে ভিকটিমের মামাতো ভাইকে গ্রেফতার করলেও ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। পরবর্তীতে পিবিআই, কিশোরগঞ্জ জেলা মামলাটি স্ব-উদ্যোগে গ্রহণ করে তদন্ত শুরু করে। কিন্তু দীর্ঘ আট মাস যাবত নিবিড় তদন্তের পরেও মামলাটি পুরোপুরি অমীমাংসিত ও ক্লুলেস অবস্থায় থেকে যায়।

​ঠিক এই সময়ে ঘটনার নেপথ্য অনুসন্ধানে নামেন স্থানীয় সাংবাদিক আলি হায়দার। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে তিনি বিভিন্ন গোপন সূত্র, তথ্য-উপাত্ত এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিবিড় অনুসন্ধান চালান। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন, নিহত জাহাঙ্গীর মিয়ার সঙ্গে একই এলাকার এক বিবাহিত নারীর দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল এবং সেই সম্পর্কের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। সাংবাদিক আলি হায়দার তার অনুসন্ধানে পাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পিবিআইয়ের তদন্ত দলের কাছে হস্তান্তর করেন।

​এই তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই কিশোরগঞ্জের তদন্তকারী দল তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গত ১ জুন ২০২৬ তারিখে পিবিআই কুলিয়ারচর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সন্দিগ্ধ আসামি হুসনা খাতুনকে গ্রেফতার করে। পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে হুসনা হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

​হুসনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৪ জুন ২০২৬ তারিখে পিবিআইয়ের একটি চৌকস দল কিশোরগঞ্জ শহরের বড়পুল এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে মামলার প্রধান ও মূল আসামি শহীদ মিয়াকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

​পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীর মিয়ার বিয়ের পূর্ব থেকেই হুসনা খাতুনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পর কয়েক বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও প্রায় তিন বছর আগে তাদের মধ্যে আবারও পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তারা প্রায়শই শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় হুসনা খাতুনকে তার স্বামী শহীদ মিয়া ক্ষেত থেকে খড় নিয়ে আসতে বলেন। ভিকটিম জাহাঙ্গীর আশেপাশে ওত পেতে ছিলেন। সুযোগ বুঝে হুসনাকে নিকটস্থ নেপিয়ার ঘাস ক্ষেতে নিয়ে তারা শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। এদিকে স্ত্রী ফিরতে দেরি করায় শহীদ মিয়া একটি ধারালো ছুরি নিয়ে তাকে খুঁজতে বের হন। একপর্যায়ে ঘাস ক্ষেতের ভেতর স্ত্রীকে জাহাঙ্গীরের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে শহীদ মিয়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে জাহাঙ্গীরের পিঠে ও পেটে উপুর্যপরি আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরে জাহাঙ্গীরের হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যান।

​এই বিষয়ে জানতে চাইলে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিক আলি হায়দার বলেন, "হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় তদন্ত চললেও মামলাটি কার্যত ক্লুলেস ছিল। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সন্দেহের তালিকার বাইরে গিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাই। প্রথমে বিষয়টি অনেকের কাছেই মূল মোটিভ থেকে ভিন্ন মনে হয়েছিল। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমি নিশ্চিত হই যে এটিই তদন্তের টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে তথ্য অনুসন্ধানের কারণেই এই মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের পথ তৈরি হয়েছে।"

​পিবিআই কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, "হত্যাকাণ্ডটি মূলত পরকীয়া সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সাংবাদিকের দেওয়া অনুসন্ধানী তথ্যের সমন্বয়ে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই বিজ্ঞ আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনো অব্যাহত আছে।"

​দীর্ঘদিন পর এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও মূল আসামিরা গ্রেফতার হওয়ায় কুলিয়ারচরের স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। একই সাথে একজন সাংবাদিকের বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানি ভূমিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ এলাকাবাসী।



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »





আরও খবর


সর্বশেষ সংবাদ
⇒সর্বশেষ সব খবর...
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর: মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন জিটু
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : প্ল্যানার্স টাওয়ার, ১০তলা, ১৩/এ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামটর, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮-০২-৪১০৬৪১১১, ৪১০৬৪১১২, ৪১০৬৪১১৩, ৪১০৬৪১১৪, ফ্যাক্স: +৮৮-০২-৯৬১১৬০৪,হটলাইন : +৮৮-০১৯২৬৬৬৭০০৩-৪
ই-মেইল : pressgonokantho@gmail.com, videogonokantho@gmail.com, cvgonokantho@gmail.com, editorgonokantho@gmail.com, web : www.gonokantho.com