| শিরোনাম |
|
কাজিন বিয়ে, শরিয়তের বৈধতা, বিজ্ঞানের সতর্কতা
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
|
বিবাহ মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার, বংশধারা, সামাজিক স্থিতি ও সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এর ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মে আত্মীয়তার নির্দিষ্ট স্তরের মধ্যে বিবাহের প্রচলন ছিল এবং এখনো রয়েছে। মুসলিম সমাজে চাচাতো, মামাতো, খালাতো ও ফুফাতো আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত ও শরিয়তসম্মত একটি প্রথা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে আধুনিক জিনতত্ত্ব ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। অনেক দেশ জনস্বাস্থ্যগত বিবেচনায় আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ নিরুৎসাহিত করছে, আবার অনেক দেশ বৈধ রেখেও স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের বিবাহের বৈধতা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে যেসব নারীর সঙ্গে বিবাহ চিরতরে হারাম, তাদের বিস্তারিত তালিকা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়ে, দুধমা, দুধবোন এবং অন্যান্য মাহরাম আত্মীয়দের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু চাচাতো, মামাতো, খালাতো কিংবা ফুফাতো বোনদের এই নিষিদ্ধ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইসলামী শরিয়তের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যাকে হারাম ঘোষণা করেননি, সে সম্পর্ক বৈধতার মধ্যেই গণ্য হবে। এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় সূরা আল-আহযাবের ৫০ নম্বর আয়াতে। সেখানে মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ সা. এর জন্য চাচা, ফুফু, মামা ও খালার কন্যাদের বৈধতার কথা উল্লেখ করেছেন। বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম ইবন কাসির রহ., ইমাম তাবারি রহ. এবং ইমাম কুরতুবি রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, আত্মীয়তার এই স্তরে বিবাহ বৈধ হওয়ার ব্যাপারে এটি একটি সুস্পষ্ট কুরআনিক দলিল। চার মাযহাবের ইমামদের মধ্যেও এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম মালিক রহ., ইমাম শাফেয়ী রহ. এবং ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহ. সকলেই একমত যে চাচাতো, মামাতো, খালাতো ও ফুফাতো আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ সম্পূর্ণ জায়েজ। ইসলামী ফিকহের শত শত গ্রন্থে এ বিষয়ে উম্মাহর ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসেও এ ধরনের বিবাহের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর ফুফাতো বোন হযরত জয়নব বিনতে জাহশ রা. কে বিবাহ করেছিলেন। একইভাবে হযরত আলী রা. ও হযরত ফাতিমা রা. এর বিবাহও ছিল চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং মুসলিম ইতিহাসের বহু খ্যাতিমান পরিবারের মধ্যেও এ ধরনের বিবাহের নজির পাওয়া যায়। ফলে ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই এটি স্বাভাবিক, বৈধ এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তবে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি বৈধতার পাশাপাশি কল্যাণ, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার প্রতিও গুরুত্ব দেয়। কোনো কিছু বৈধ হওয়া মানেই সেটি সব পরিস্থিতিতে সমানভাবে উপযোগী হবে এমন দাবি ইসলাম করে না। বরং ইসলাম মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, বংশধারা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণকে শরিয়তের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করে। ইমাম শাতিবি রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুওয়াফাকাত-এ উল্লেখ করেছেন যে, শরিয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো বংশধারা সংরক্ষণ। একইভাবে ইমাম গাজ্জালী রহ. এবং ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. মানুষের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণকে শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ইসলাম বৈধতার পাশাপাশি সুস্থ ও কল্যাণকর সমাজ গঠনের দিকেও দৃষ্টি রাখে। আধুনিক জিনতত্ত্বের গবেষণায় আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। বিশ্বের খ্যাতিমান জিনতত্ত্ববিদ অধ্যাপক অ্যালান এইচ. বিটলস দীর্ঘদিন ধরে আত্মীয়-বিবাহ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা ও অতিরঞ্জন রয়েছে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেছেন যে, কিছু বংশগত রোগের ঝুঁকি সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে। জিনতত্ত্ব অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষের শরীরে কিছু সুপ্ত বা গোপন জিন থাকে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় না। কিন্তু যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের শরীরে একই ধরনের ক্ষতিকর সুপ্ত জিন থাকে, তাহলে সন্তানের মধ্যে কিছু বংশগত রোগ প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি হতে পারে, কারণ তাদের জিনগত উৎস আংশিকভাবে অভিন্ন। তবে আধুনিক গবেষণা এটিও দেখিয়েছে যে, একবারের কাজিন বিবাহ এবং বহু প্রজন্ম ধরে ধারাবাহিক আত্মীয়-বিবাহ এক বিষয় নয়। বহু প্রজন্ম ধরে একই বংশের মধ্যে বারবার বিবাহ হলে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়। এজন্য আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পারিবারিক রোগ-ইতিহাস বিশ্লেষণ এবং জেনেটিক পরামর্শ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়। বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইনসহ বহু মুসলিম দেশে বিবাহপূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক বা উৎসাহিত করা হয়। এর উদ্দেশ্য আত্মীয়-বিবাহ নিষিদ্ধ করা নয়, বরং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে পরিবারকে সচেতন করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী এবং জেনেটিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা আত্মীয়-বিবাহকে সর্বজনীনভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি, বরং পারিবারিক রোগের ইতিহাস, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে। ইসলামী ঐতিহ্যেও বংশের বাইরে বিবাহের প্রতি উৎসাহের কিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর নামে প্রচলিত কিছু বর্ণনায় ভিন্ন পরিবারে বিবাহের উৎসাহের কথা উল্লেখ রয়েছে। যদিও এসব বর্ণনার সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তবুও সামাজিক সম্পর্ক বিস্তৃত করা এবং বংশগত বৈচিত্র্য বজায় রাখার বিষয়টি ইসলামী চিন্তাধারায় ইতিবাচকভাবে বিবেচিত হয়েছে। অতএব, ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ। ইসলাম চাচাতো, মামাতো, খালাতো ও ফুফাতো আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহকে বৈধ ঘোষণা করেছে এবং এ বিষয়ে ইসলামী আইনশাস্ত্রে কোনো মতভেদ নেই। একই সঙ্গে ইসলাম মানুষের স্বাস্থ্য, বংশধারা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণকেও গুরুত্ব দিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানও এ ধরনের বিবাহকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি, বরং নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা পরামর্শ গ্রহণের কথা বলেছে। ফলে ধর্মীয় বৈধতা এবং বৈজ্ঞানিক সচেতনতা দুই বাস্তবতাকে একত্রে বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অধিকতর বিচক্ষণতার পরিচায়ক। ইসলাম যেখানে বৈধতার পথ উন্মুক্ত রেখেছে, সেখানে বিজ্ঞান মানুষকে সতর্কতা ও সচেতনতার শিক্ষা দিয়েছে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ, সচেতন ও দায়িত্বশীল পরিবারব্যবস্থা। তথ্যসূত্র, পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসা (২৩-২৪), সূরা আল-আহযাব (৫০); তাফসির ইবন কাসির, তাফসির তাবারি, তাফসির কুরতুবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জার্নাল অব কমিউনিটি জেনেটিক্স, হিউম্যান হেরেডিটি, ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (বিএমজে), দ্য ল্যানসেট। লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর mdraiyan6790@gmail.com |