| শিরোনাম |
|
লটকনের দেশ নরসিংদীতে এবার বাম্পার ফলন, লটকন চাষীদের মুখে সোনালী হাসি
আবুল কালাম আজাদ, রায়পুরা, নরসিংদী।
|
বাংলাদেশের ফলের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নরসিংদী। এই জেলার নাম শুনলেই যেমন ভেসে ওঠে শীতলক্ষ্যা ও মেঘনার তীরের উর্বর জনপদের ছবি, তেমনি মনে পড়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় মৌসুমি ফল লটকনের কথা। সময়ের পরিক্রমায় নরসিংদী এখন শুধু একটি জেলার নাম নয়, বরং দেশের “লটকনের রাজধানী” হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হওয়ায় জেলার হাজার হাজার চাষির মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।বিশেষ করে নরসিংদীর শিবপুর ও বেলাব উপজেলা লটকন চাষে দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। এখানকার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদজুড়ে চোখে পড়ে লটকনের বাগান। গাছের ডালে ডালে ঝুলে থাকা সোনালি-হলুদ রঙের থোকা থোকা লটকন যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্যের বার্তা বহন করে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কয়েক দশক আগে নরসিংদীর বিভিন্ন গ্রামে বাড়ির আঙিনায় সীমিত পরিসরে লটকনের চাষ শুরু হয়। পরে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা উপলব্ধি করে কৃষকরা বৃহৎ আকারে বাগান গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে শিবপুর ও বেলাব উপজেলার মাটি, আবহাওয়া এবং পরিবেশ লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এখানে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে এ ফল। একসময় যে লটকন ছিল শুধুই গ্রামীণ ফল, আজ তা জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যে পরিণত হয়েছে। নরসিংদীর লটকন এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে নরসিংদীর লটকনের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লটকনের ফলন হয়েছে আশানুরূপ। জেলার বিভিন্ন বাগানে গাছে গাছে ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে ডালপালা। কৃষকরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ মৌসুমে ফলন অনেক ভালো হয়েছে। বেলাব উপজেলার অধিকাংশ চাষিরই রয়েছে ৪০ থেকে ৫০টি কিংবা তারও বেশি লটকন গাছ। অনেক পরিবার বছরের বড় একটি অংশের আয় এই লটকন বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে ফল কিনে নিয়ে যান। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, একটি পরিপক্ব গাছ থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল পাওয়া যায়। বাজারে ভালো দাম থাকলে একজন কৃষক শুধু লটকন বিক্রি করেই কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে সক্ষম হন। এ আয় দিয়ে তারা সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়া ও পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করেন। নরসিংদীর লটকন শুধু কৃষকদের নয়, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানেরও উৎস। মৌসুমে বাগান পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, পরিবহন, প্যাকেটজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন অসংখ্য শ্রমিক। স্থানীয় অর্থনীতিতে লটকনের প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে মৌসুম এলেই গ্রামীণ বাজারগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। পরিবহন ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ফলকে কেন্দ্র করে আয়-রোজগারের সুযোগ পান। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নরসিংদীর লটকনের স্বাদ ও গুণগত মান দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা বাড়ছে। আধুনিক সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং সুবিধা আরও উন্নত করা গেলে রপ্তানি আয় বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, লটকনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত কৃষি-শিল্প গড়ে তোলা গেলে নরসিংদী দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রয়োজন। লটকনের মৌসুমে শিবপুর ও বেলাবের বাগানগুলো দেখতে প্রতিদিন ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। ফলভর্তি বাগানের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। অনেকেই পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসে সরাসরি বাগান থেকে লটকন কিনে নিয়ে যান। এ কারণে স্থানীয়ভাবে কৃষিভিত্তিক পর্যটনেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে লটকনের বাগানকে কেন্দ্র করে নতুন পর্যটন শিল্প গড়ে উঠতে পারে। লটকন চাষিরা বলছেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে তারা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন। পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণাগার, সহজ পরিবহন ব্যবস্থা এবং রপ্তানি সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। একসময় গ্রামের আঙিনার পরিচিত ফল লটকন আজ নরসিংদীর পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিবপুর ও বেলাব উপজেলার হাজারো কৃষকের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন এই ফল। চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলনে কৃষকদের মুখে ফিরেছে হাসি। ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও সম্ভাবনার অনন্য সমন্বয় হয়ে নরসিংদীর লটকন আজ দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজের অবস্থান শক্ত করছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে “লটকনের দেশ নরসিংদী” আরও গৌরবময় উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। |