| শিরোনাম |
|
ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাগান: জলরঙে আঁকা এক স্বপ্নরাজ্য
জুবাইয়া বিন্তে কবির
|
![]() ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাগান: জলরঙে আঁকা এক স্বপ্নরাজ্য ভিমরুলির সেই আশ্চর্য পৃথিবী : ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভিমরুলি গ্রাম, পিরোজপুরের আটঘর-কুড়িয়ানার অঞ্চল এবং বরিশালের কীর্তিপাশা খালজুড়ে শত শত বছর ধরে গড়ে উঠেছে এই অনন্য বাগান। পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, পানিতেই গড়ে ওঠা হাট—যা আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান বাজার হিসেবে। বৃষ্টির মৌসুমে যখন মাঠভূমি ডুবে যায়, তখন বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে পেয়ারার গাছ। নৌকা ভাসিয়ে কৃষকরা পৌঁছে যান গাছের ডালে, সংগ্রহ করেন পাকা পেয়ারা। বিক্রিও হয় সেখানেই, মাঝ খালের নৌকার ওপর। ক্রেতা, বিক্রেতা, দর্শনার্থী সবাই মিশে যান এক রঙিন উৎসবে। স্থানীয় কৃষক লক্ষণ রায়, হরেন রায়, হরিপদ, সঞ্জয়, কালা ও মনোরঞ্জন মনা বলেন, “আগে শুধু পেয়ারা বিক্রি হতো, এখন পর্যটকের কারণে আয় দ্বিগুণ। নৌকা ভাড়া, খাবার দোকান, গাইড সব মিলিয়ে গ্রামটাই যেন উৎসবমুখর।” কেন যাবেন এই ভাসমান বাগানে? ১. অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য গাছের ডাল ছুঁয়ে যাওয়া সরু খালের পথ, চারদিকে সবুজে ঘেরা জলরাশি আর মাথার ওপরে মেঘের ছায়া। ২. অভিজ্ঞতার ভিন্নতা – আমাদের দেশে ভাসমান বাজার খুবই বিরল। বিদেশের থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের ভাসমান বাজারের মতোই, বরং আরও সবুজ, আরও দেশি ঘ্রাণমাখা। ৩. টাটকা ফলের স্বাদ – সরাসরি গাছ থেকে তোলা পেয়ারা, আমড়া কিংবা লেবুর স্বাদ অন্য কোথাও পাবেন না। ৪. লোকজ সংস্কৃতি – নৌকায় ভেসে ভেসে কেনাবেচা, কৃষকের হাসি, স্থানীয় খাবার, সব মিলিয়ে এক লোকজ উৎসব। ৫. ফটোগ্রাফির স্বর্গরাজ্য – শত শত নৌকা আর পান্নার মতো ঝলমলে পেয়ারায় ভরে থাকা খালের দৃশ্য ফ্রেমে বন্দি করতে চাইবেন বারবার। ঢাকার পাগলা এলাকা থেকে আসা পর্যটক কবি ও সাহিত্যিক দিলরুবা ইয়াছমিন ইসরাত ও সাহিত্যিক শামসুল হক সাগর বলেন,“সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দেখে এসেছিলাম। কিন্তু সরাসরি এসে যে মুগ্ধ হব এতটা, ভাবিনি। নৌকায় বসে পেয়ারা খাওয়ার আনন্দ কোনোভাবেই ভুলতে পারব না।” বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের চোখে ভাসমান বাগান : ভ্রমণপিপাসু তরুণেরা এ বাগানে এসে যেন প্রকৃতির নতুন পাঠ নেন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের এমবিএ'র শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম রাতুল, মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ৮ম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সোহেল রানা জনি এবং কৃষি অনুষদের ৬ষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী রোকেয়া জামান তৃশা বলেন,“বন্ধুদের নিয়ে আসার পর মনে হলো আমরা যেন এক উৎসবের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পেয়ারা কেনা, নৌকায় ঘুরে বেড়ানো—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।” বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ নাফিউ বিন ইমাদ জাইফ, মুহাম্মদ মুহাম্মদ মুইনুল হক খান এবং মুহাম্মাদ মুনিরুল হক খান মনির বলেন,“অনলাইনে ছবিতে দেখেছিলাম, কিন্তু এখানে এসে মনে হলো—এ যেন বাস্তবে রূপ নেওয়া এক লোককথা। প্রতিটি নৌকা, প্রতিটি মানুষের হাসি মনে হয় গল্প বলছে।” পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আলিশা তাবাসসুম তানজিলা এবং হাফসা বিন্তে ইমাদ হুমায়রা বলেন,“আমাদের চারপাশে এত সৌন্দর্য আছে, অথচ আমরা জানিই না। নৌকায় ভাসতে ভাসতে মনে হচ্ছিল সময় যেন থমকে গেছে। বিদেশে না গিয়েই এখানে অনন্য এক অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।” ফরিদপুরের টাইমস ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আনিসা তাবাসসুম ইফতি, মায়মুনা বিন্তে ইমাদ জায়রা এবং অধোরা তাবাসসুম সাদিয়া বলেন, “আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রথমবার এসেছি। বরিশালের এত কাছে এমন অসাধারণ জায়গা আছে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। লাইফের বেস্ট ট্রাভেল মোমেন্টগুলোর একটি হয়ে থাকবে।” ভ্রমণের পথনির্দেশ : ঢাকা থেকে বরিশাল : ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে পারেন তিনভাবে, লঞ্চে: সদরঘাট থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় লঞ্চ ছাড়ে। ভাড়া ২৫৫ টাকা (ডেক) থেকে ১০ হাজার টাকা (ভিআইপি কেবিন) পর্যন্ত। রাতের নদীপথের সৌন্দর্য আকাশভরা তারা, চাঁদের আলোয় নদী, দূরের লঞ্চের আলো—অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হবে। বাসে: গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী থেকে সরাসরি বাস চলে পদ্মাসেতু হয়ে। এসি-ননএসি ভেদে ভাড়া ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা। বিমানে: প্রতিদিন ঢাকা থেকে বরিশালে ফ্লাইট রয়েছে। ভাড়া সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা। আধাঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন। বরিশাল থেকে ভিমরুলি : বরিশাল শহর থেকে রিকশা বা অটোতে কীর্তিপাশা ঘাট, সেখান থেকে ছোট নৌকা বা ট্রলারে ভেসে পৌঁছাতে পারবেন ভিমরুলির ভাসমান বাগানে। ভাড়া: দাঁড়টানা নৌকা ১৫০০-২০০০ টাকা। ছোট নৌকা দুই-তিনজনের জন্য আদর্শ। আগেই দরদাম করে নেওয়া ভালো। বৌদির হোটেল: খালের বুকে ক্ষুধামোচন : ঘুরতে ঘুরতে যদি ক্ষুধা পেয়ে বসে, তবে অপেক্ষা করছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা—বৌদির হোটেল। খালের ওপর ভাসমান এই হোটেলে মিলবে ভাত, দেশি মাছের ঝোল, চিংড়ি ভুনা, আমড়ার আচার। দামও একেবারেই নাগালের মধ্যে। নৌকা থেকে নেমে ভাসমান বারান্দায় বসে গরম ভাত খাওয়া—এমন অভিজ্ঞতা জীবনে ক’বারই বা আসে? ![]() ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাগান: জলরঙে আঁকা এক স্বপ্নরাজ্য স্থানীয় জীবন ও মানুষের গল্প : এই বাগান শুধু পর্যটনের সৌন্দর্য নয়, মানুষের জীবিকারও অন্যতম উৎস। কৃষকরা পেয়ারা বিক্রি করে আয় করেন। নৌকা চালকরা পর্যটক ঘুরিয়ে উপার্জন করেন। স্থানীয় নারীরা হস্তশিল্প বিক্রি করেন ছোট ছোট দোকানে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ৪র্থ সেমিস্টার এর শিক্ষার্থী তৃষা বলেন, “বন্ধুদের নিয়ে আসার পর মনে হলো আমরা যেন এক উৎসবের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পেয়ারা কেনা, নৌকায় ঘুরে বেড়ানো—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।” কখন যাবেন : আগামী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টাই সবচেয়ে উপযুক্ত। এ সময়টায় ভরে ওঠে পেয়ারা ও আমড়ায়। খালের মোহনায় তখন জমে ওঠে শত শত নৌকার হাট। কোথায় থাকবেন : বরিশাল শহরে ভালো মানের বেশ কয়েকটি হোটেল আছে, হোটেল এরিনা। গ্র্যান্ড পার্ক। হোটেল ওয়ান ইন্টারন্যাশনাল। হোটেল রোদেলা। হোটেল এথেনা ইন্টারন্যাশনাল। হোটেল সেডোনা : এছাড়াও সাধারণ মানের হোটেলও আছে। ভাড়া ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে, সুবিধা অনুযায়ী। সতর্কতা : ১. ছাতা ও রেইনকোট নিতে ভুলবেন না বর্ষার বৃষ্টি হুট করেই নামে। ২. পানির বোতল ও শুকনো খাবার সঙ্গে রাখুন। ৩. প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। খালে কোনো প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলবেন না। ৪. নৌকায় চলাচলে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন। সম্ভাবনা ও সংরক্ষণ : প্রতিবছর ঝালকাঠি সদর উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকার মতো। দেশের মোট পেয়ারার ৮০ শতাংশ আসে এখান থেকে। পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা যুক্ত হয়ে এ অঞ্চল আজ জাতীয় গৌরব হয়ে উঠছে। স্থানীয় প্রশাসন পর্যটকের নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। সরকারের পরিকল্পনাও রয়েছে এ ঐতিহ্যকে বিশ্ব পর্যটনে তুলে ধরার। পরিশেষে, ঝালকাঠির ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাগান আমাদের শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নয়, বরং তাকে আপন করে নিয়েই টিকে থাকার পথ খুঁজে নেওয়া যায়। জলাবদ্ধ ভূপ্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে এখানকার মানুষ যে কৃষি-ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে, তা শুধু অর্থনীতির নয়; এটি উদ্ভাবনী চিন্তা, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের এক অনন্য উদাহরণ। শত বছরের এই ঐতিহ্য আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটনেরও আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। ভাসমান নৌকায় কেনাবেচা, খালের বুকে কৃষকের নিরলস শ্রম, গাছ থেকে সদ্য তোলা পেয়ারার সুবাস, বর্ষার মায়াবী আলো-ছায়ার খেলা—সবকিছু মিলিয়ে ঝালকাঠির এই জনপদ যেন বাংলার জলরঙে আঁকা এক জীবন্ত কবিতা। এখানে এলে বোঝা যায়, সৌন্দর্য শুধু পাহাড়ে বা সমুদ্রে নয়; সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে আমাদের গ্রামীণ জীবনের সরলতায়, মানুষের আন্তরিকতায় এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর বন্ধনে। আজ যখন আধুনিকতার দৌড়ে আমরা শিকড়ের টান ভুলতে বসেছি, তখন ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাগান আমাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয় বাংলাদেশের প্রকৃত রূপের সঙ্গে। তাই এই ঐতিহ্য রক্ষা করা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। যারা একবার এই জলভূমির বুক চিরে নৌকায় ভেসেছেন, পেয়ারাভর্তি ডালের নিচে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির নির্মল স্পর্শ অনুভব করেছেন, তারা জানেন এ শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি হৃদয়ে গেঁথে থাকা এক অনুভূতির নাম। ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাগান তাই বাংলাদেশের সৌন্দর্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক, যা বারবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের এই ছোট্ট দেশটিও প্রকৃতির অপার বিস্ময়ে ভরপুর। সত্যিই, বাংলাদেশ সুন্দর; আর সেই সৌন্দর্যের এক অনিন্দ্য নাম ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাগান। লেখক পরিচিতি : জুবাইয়া বিন্তে কবির অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট |