| শিরোনাম |
|
মহররম, ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও ঈমানি চেতনার এক মহিমান্বিত অধ্যায়
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
|
![]() মহররম, ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও ঈমানি চেতনার এক মহিমান্বিত অধ্যায় পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি, যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকেই তা আল্লাহর বিধানে নির্ধারিত। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।' (সূরা আত-তাওবা ৩৬) তাফসিরবিদদের সর্বসম্মত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই চারটি সম্মানিত মাস হলো জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। ইসলামের আগেও আরবরা এই মাসগুলোর মর্যাদা স্বীকার করত। তবে ইসলাম এসে এ মর্যাদাকে আল্লাহপ্রদত্ত বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। রাসূলুল্লাহ সা. মহররম সম্পর্কে বলেছেন, 'রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস, ১১৬৩) এই হাদিসে মহররমকে 'শাহরুল্লাহ' বা 'আল্লাহর মাস' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বছরের অন্য কোনো মাসকে এভাবে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করা হয়নি। ইমাম নববী রহ. লিখেছেন, কোনো কিছুকে আল্লাহর দিকে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত করা তার মর্যাদা ও সম্মানের প্রমাণ। মহররমের গুরুত্ব কেবল একটি সম্মানিত মাস হওয়ার কারণে নয়, বরং ইসলামী ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে এ মাস জড়িয়ে আছে। প্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়, বহু নবীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও এই সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে। যদিও এসব বর্ণনার সবগুলো সমমানের শক্তিশালী নয়, তবু মুসলিম সমাজে মহররমকে বরকতময় মাস হিসেবে দেখার পেছনে এ ঐতিহাসিক স্মৃতিরও ভূমিকা রয়েছে। মহররমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো আশুরা, অর্থাৎ মহররমের দশম দিন। এই দিনের ফজিলত সম্পর্কে সহিহ হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। যখন রাসূলুল্লাহ সা. মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি দেখতে পান ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, এই দিনে আল্লাহ মূসা আ. ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, 'মূসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরাই বেশি হকদার।' এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি,২০০৪, সহিহ মুসলিম, ১১৩০) আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, 'আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।' (সহিহ মুসলিম, ১১৬২) তবে নবী সা. ইহুদিদের থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য শুধু দশ তারিখ নয়, তার সঙ্গে নবম বা একাদশ তারিখ মিলিয়ে রোজা রাখারও উৎসাহ দিয়েছেন। এজন্য অধিকাংশ আলেম ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখাকে উত্তম বলেছেন। মহররম মাসের ইতিহাসের আরেকটি বেদনাবিধুর অধ্যায় হলো কারবালার ঘটনা। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররমে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রিয় দৌহিত্র, জান্নাতি যুবকদের নেতা, হযরত হুসাইন রা. শাহাদাতবরণ করেন। ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল এক গভীর সংকটময় ঘটনা। তাঁর শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে আজও বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে হযরত হুসাইন রা. ছিলেন সত্য, ন্যায় ও নীতির প্রতীক। তাঁর শাহাদাত মুসলিম ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়। তবে একই সঙ্গে আলেমগণ সতর্ক করেছেন যে, এই শোক পালনের নামে আত্মপ্রহার, মাতম, শরীর ক্ষতবিক্ষত করা কিংবা শরিয়াহবিরোধী আচরণ ইসলামে বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, 'যে ব্যক্তি গালে আঘাত করে, জামা ছিঁড়ে এবং জাহেলি যুগের মতো আহাজারি করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।: (সহিহ বুখারি, ১২৯৪) এ কারণে ইসলামের মূল শিক্ষা হলো কারবালার ঘটনাকে আবেগ নয়, শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা। হুসাইন রা. এর আত্মত্যাগ আমাদের সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কষ্ট সহ্য করার শিক্ষা দেয়। ইসলামী ইতিহাসে মহররমের আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে হিজরি সনের সঙ্গে এর সম্পর্কের কারণে। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগে যখন মুসলিম রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন সাহাবিদের পরামর্শে হিজরতকে ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। আর বছরের প্রথম মাস হিসেবে নির্বাচন করা হয় মহররমকে। ফলে মহররম শুধু একটি মাস নয়, বরং মুসলিম সভ্যতার সময় গণনার সূচনাবিন্দুও বটে। মহররম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কেবল অতীত নয়, ইতিহাস ভবিষ্যতের পথনির্দেশকও। আশুরা আমাদের শেখায় আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, মূসা আ. এর বিজয় আমাদের শেখায় জুলুমের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, আর কারবালা আমাদের শেখায় সত্যের জন্য আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায় না। আজকের বিশ্বে যখন মুসলিম সমাজ নানা সংকট, বিভাজন ও মূল্যবোধের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন মহররমের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের আত্মসমালোচনা, তাওবা, ইবাদত, ধৈর্য, ন্যায়বিচার এবং ঈমানি দৃঢ়তার দিকে আহ্বান জানায়। নতুন বছরের শুরুতে মহররম যেন শুধু ক্যালেন্ডারের একটি নতুন পৃষ্ঠা না হয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নতুন অঙ্গীকার হয়ে উঠুক। কারণ মহররমের প্রকৃত বার্তা শোকের নয়, জাগরণের, বিভেদের নয়, শিক্ষার, আর ইতিহাসের নয়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের। লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর |