| শিরোনাম |
|
অভিযোগের পাহাড়, তবুও নীরব রাজউক? ইমারত পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে নানা প্রশ্ন
স্টাফ রিপোর্টার | দৈনিক গণকণ্ঠ
|
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর জোন-৩/২-এর ইমারত পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, নিয়মবহির্ভূত নির্মাণে সহযোগিতা, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে দাখিল করা লিখিত অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে।তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা অন্য কোনো সরকারি তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ জাকির পাটোয়ারী নামে এক ব্যক্তি রাজউক ও দুদকে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে দাবি করা হয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনবিহীন বা নিয়মবহির্ভূত ভবন সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ব বাড্ডার একটি প্ল্যানবিহীন ভবনের মালিকের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা, ডা. আলমাসের ভবন সংক্রান্ত একটি ঘটনায় ১৮ লাখ টাকা এবং দক্ষিণ আনন্দনগরের একটি বহুতল ভবনের মালিকের কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ভবন মালিকদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এড়াতে আদালতে রিট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদিও এ অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। এদিকে কয়েকজন ভুক্তভোগী দাবি করেছেন, বিভিন্ন ভবনের বিরুদ্ধে নোটিশ জারির পর তা নিষ্পত্তি বা শিথিল করার আশ্বাস দিয়ে অর্থ দাবি করা হতো। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে মোবাইল কোর্ট, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কিংবা উচ্ছেদের ভয় দেখানো হতো। মধ্য পীরেরবাগসহ কয়েকটি এলাকার ভবন মালিকরা ভবনপ্রতি দুই লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, আবুল কালাম আজাদের দায়িত্বাধীন এলাকায় একাধিক নির্মাণাধীন ভবন রাজউকের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কিছু ক্ষেত্রে নকশা অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই ভবন নির্মাণ শুরু করা হয়েছে, আবার কিছু ভবন অনুমোদিত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাদের দাবি, নিয়মবহির্ভূত নির্মাণকাজ চলমান থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি বা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের পর্যবেক্ষণ এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। এছাড়া রাইসা বিল্ডার্স নামে একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের একটি প্রকল্প নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মিরপুর ৬০ ফিট এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির একটি ভবনে নির্মাণ ত্রুটি এবং অনুমোদনবিহীন বাণিজ্যিক ব্যবহার সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিষ্পত্তির নামে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা কিংবা সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। কিছু অভিযোগকারী দাবি করেছেন, নগদ অর্থ লেনদেনের কিছু ঘটনা সিসিটিভি ফুটেজে ধারণ রয়েছে। তবে ওই ফুটেজগুলোর সত্যতা কিংবা প্রাসঙ্গিকতা দৈনিক গণকণ্ঠের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, আবুল কালাম আজাদের সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, চাকরিতে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যে তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজধানী ঢাকা, সাভার, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় তার বা তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে বাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, একাধিকবার বদলি হওয়ার পরও তিনি প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ জোনে ফিরে আসেন। সাবেক ও বর্তমান কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর একটি পত্রিকার সম্পাদককে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অনুমোদনহীন ও নিয়মবহির্ভূত ভবন কেবল প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। ফায়ার এক্সেস, জরুরি নির্গমন পথ, পর্যাপ্ত সেটব্যাক ও নিরাপদ নকশা ছাড়া নির্মিত ভবন বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—লিখিত অভিযোগ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের পরও অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত হয়েছে কি না। অভিযোগকারীরা সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনে দুদকের মাধ্যমে অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে দৈনিক গণকণ্ঠের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আলোচিত সম্পদগুলো তার বাবা-মায়ের পৈতৃক ও বৈধ সম্পদের অংশ। তিনি দাবি করেন, তার বাবা ভূমি অফিসের তহশিলদার এবং মা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাদের বৈধ আয় ও পারিবারিক সূত্র থেকেই এসব সম্পদের উৎস এসেছে। তবে অভিযোগকারীদের একটি অংশের দাবি, আলোচিত সম্পদগুলোর বেশিরভাগই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আবুল কালাম আজাদের নামে কিংবা তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে রয়েছে। এ কারণে সম্পদের প্রকৃত উৎস ও মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। দৈনিক গণকণ্ঠ এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, সম্পদের উৎস এবং অভিযোগের বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তী পর্বে আবুল কালাম আজাদ ও তার পরিবারের সম্পদের উৎস, মালিকানা, দায়িত্বাধীন এলাকায় নির্মাণ-অনিয়মের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। এছাড়া রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। |