| শিরোনাম |
|
বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত, দুঃখ নিত্য সঙ্গী তিস্তা পাড়ের মানুষের
নিজস্ব প্রতিবেদক :
|
![]() বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত, দুঃখ নিত্য সঙ্গী তিস্তা পাড়ের মানুষের পানি না আসলে ৮ থেকে ১০ মন বাদাম হইতো, ৪০-৫০ হাজার টাকা বেঁচা যাইতো, এখন দুই মন বাদামও হবে না।’ কথাগুলো বলছিলেন- রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষীটারী ইউনিয়নের চর ইসরকুল এলাকার কৃষক হাসান আলী। একই এলাকার ফারুক মিয়া স্থানীয় সমবায় সমিতি থেকে লোন নিয়ে ১২০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছিলেন বাদাম। কৃষক, বীজ, পানিসহ অন্যান্য খরচ মিলে তার ব্যয় হয়েছে ৫৫ হাজারের বেশি। আর কদিন পরে এই বাদাম তুললে খরচ মিটিয়ে লাভ হত আরো ৭০/৮০ হাজার টাকা। কিন্তু সেই টাকা জলে ভেসে গেল। শুধু কৃষক হাসান আলী আর ফারুক মিয়ার এই কষ্ট নয়। একই চিত্র তিস্তা তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের। বন্যা-খড়ার সঙ্গে জীবন যুদ্ধে বেড়ে ওঠেন এমন হাজারও মানুষের গল্প এমনই। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবছর সময়-অসময়ের বন্যায় পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। তিস্তায় পানি বাড়া-কমা খেলার সঙ্গে মূলত তিস্তার তলদেশ ভরাটের একটা বড় অঙ্ক রয়েছে। তাদের দাবি, যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে, তাতে নদীর তলদেশ ভিজিয়ে ওঠার কথা। সেখানে তিস্তার তীরবর্তীতে উঠেছে পানি। এর মূল কারণ হচ্ছে, তিস্তা সারা বছরই ভরাট থাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, প্রতিবছর দুই কোটি টনের বেশি পলি আনছে তিস্তা। উজানের পলিতে ভরাট হয়েছে নদীর বুক। রংপুর আবহাওয়া অফিস ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৯১ মিলি মিটার। এই অবস্থায় তিস্তা নদীতে বেশ পানি রয়েছে। তবে, বিপদসীমার ৮৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে বন্যা হবার সম্ভাবনা নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, গত তিন দিনের বৃষ্টিতে শুষ্ক হওয়া তিস্তা যৌবন ফিরে পেয়েছে। এতে করে চরাঞ্চলের বাদাম, ধান ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে বাদামের বড় ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা পানি নিচে থাকা এসব বাদাম নষ্টের আশঙ্কায় অপরিপক্ব সেই বাদাম ঘরে তুলছেন। এতে করে লোকসানের পড়বেন তারা। এবারের বৃষ্টিতে গঙ্গাচড়ার পূর্ব ও পশ্চিম ইচলী, কেল্লার পাড়, বাগেরহাটসহ পীরগাছা ও কাউনিয়া অংশেও বেশ কয়েকটি এলাকার শতাধিক চরাঞ্চলে পানি উঠেছে। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, বাদাম, ধান ও মৌসুমি সবজি মিলে এখন পর্যন্ত ৩৫ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে আছে বলে আমরা খবর পেয়েছি। এর বেশিও হতে পারে। কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে এখনো নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। কেন এই অবস্থা? নদী গবেষক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘২৩৮ বছরের এই নদীর কোনো পরিচর্যা হয় না। বরং বহু প্রকল্প নিয়ে নদীর ক্ষতি হয়েছে। ৩১৫ কিলোমিটারের এই নদীর ১১৫ কিমি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত। ২০১৪ সালে তিস্তার ভারতীয় অংশের গজলডোবায় বাঁধ দেয় ভারত। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও উজানি ঢলে আসা বালু আর পলি পড়ে ধীরে ধীরে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদীর গতিপথ বদল হয়ে সীমানা বাড়লেও গভীরতা কমছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা অববাহিকায় মানুষের জীবন যাত্রা স্থবির হয়ে যায়। ধুধু মরুতে পরিণত হয়। জীব-বৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ে। এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’ তিস্তা ভরাটে কী প্রভাব পড়ে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী জানান, ১৯৮৩ সালে জুলাই মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা নদীর পানির শতকরা ৩৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ এবং ৩৯ শতাংশ পাবে ভারত। বাকি ২৫ শতাংশ নদীপ্রবাহের জন্য নদীতেই সংরক্ষিত রাখা হবে। কিন্তু কখন থেকে এবং কোথা থেকে এই পানি ভাগাভাগি করা হবে সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না ওই বৈঠকে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত যৌথ বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ শতাংশ দুই দেশ ভাগ করে বাকি ২০ শতাংশ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে প্রস্তাব দেয়। ভারত এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানায়। ২০১৪ সাল গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে ভারত তিস্তার পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়। তিনি বলেন, ‘উজান থেকে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার করায়, পানির অভাবে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরে যায়, মরে গেছে। ফলে বন্যা-খরা এখানে মানুষের দুর্ভোগের কারণ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণ করা, নাব্য রক্ষা, পরিবেশ ও প্রাণ প্রকৃতি রক্ষা না করলে দ্রুত এক অশনিসংকেত দেখবে তিস্তা বেষ্টিত রংপুর অঞ্চলের মানুষ। কেমন অবস্থায় তিস্তা পাড়ের মানুষজন গতকাল মঙ্গলবার (২০ মে) গংগাচড়ার বিভিন্ন চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে, পানিতে তলিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ফসলের আবাদ তুলছেন কৃষকরা। নদীর বাঁধে সেগুলো রেখে কেউ কেউ শুকাচ্ছে। বাঁধের পাড় এলাকার কৃষক শাহের আলী বলেন, ‘মোর ছোট ব্যাটা ঢাকাত রিকশা চালায়া টাকা দিচে সেই টাকা দিয়ে বাদাম গারচুং। কিন্তু পানিতে তলি গেইচে। ব্যাটা কইচে, ক্যাংকা হয় হোক তোমরা বাদাম তোলো। বাদাম তোলোচি কিন্তু লস হইবে।’ চর পশ্চিম ইচলি গ্রামের জব্বার আলী বলেন, ‘এই হামার কষ্ট শুরু হইল। একবার পানি আসপে আর হামার ক্ষতি করি যাইবে। কষ্ট করি নদীর পাড়োত আবাদ করি, কোনো বোর বছর সেই আবার ঘরে তুলবের পাই না। পানির নিচোত পরি থাকে। যে ঢকছন (অবস্থা) এবার মনে হয় আবাদ পানি নিয়ে যাইবে।’ একই ইউনিয়নের মজিবর বলেন, ‘হামার কষ্ট কাই দেখে। সরকার নদীও বান্ধি দিবার নেয়। হামারগুলার কোনো সামাধানও দিবার নেয়।’ রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, ‘বৃষ্টি এবং উজানের বাড়ন্ত পানিতে তিস্তায় বেশ পানি এসেছে। নদীর পানি বিপদসীমার উপরে ওঠার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে নেই। কিছু কিছু এলাকায় ভাঙন খবর এসেছে, আমরা সেগুলোর ভাঙন ঠেকাতে কাজ করছি।’ |